rab

“১২ দিনে নিহত ৮”

chardike-ad

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ চলছে। অবরোধকে কেন্দ্র করে সংগঠিত নাশকতা ঠেকাতে রাজধানীসহ দেশজুড়ে পুলিশ ও র‌্যাবের গণগ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতারের পর সন্দেহভাজন নাশকতাকারী ও এ কাজে নির্দেশদাতাকে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নামছে ‘বিশেষ অভিযানে’। এসময় ঘটছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা। নিহত হচ্ছে ‘নাশকতাকারী’।

তবে এসব ঘটনাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বলতে নারাজ নিহত ব্যক্তিদের পরিবার। তাদের অভিযোগ কয়েকদিন নিখোঁজ থাকার পর স্বজনদের এমন নিহত হওয়ার ঘটনা নিছক সাজানো। নিহত ব্যক্তিদের আগেই গ্রেফতার করা হয়।

চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে ২৮ জানুয়ারি বিকেল পর্যন্ত এ ১২ দিনে র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ৮ জন। এদের মধ্যে পাঁচজন বিএনপি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাকি তিনজনকে ডাকাত বলছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

বুধবার ভোর রাতে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের অভয়তলা গ্রামে পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রফিকুল ইসলাম (৩৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ সময় দুই পুলিশ সদস্যও আহত হন বলে পুলিশ দাবি করেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি শাটার গান ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত রফিকুল ইসলাম উপজেলার পাটকেলঘাটার নোয়াকাটি গ্রামের মৃত বাবর আলীর ছেলে।

তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওসি জানান, মঙ্গলবার বিকেলে ১২ ডাকাতি মামলার আসামি রফিকুল ইসলামকে তার নিজ বাড়ি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রাতে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলে তাকে নিয়ে অভিযানে বের হয় পুলিশ। তার দেওয়া তথ্য মতে, কুমিরা ইউনিয়নের অভয়তলা গ্রামে পৌঁছলে রফিকুলের সহযোগী ডাকাতরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। দীর্ঘ ২০ মিনিট ধরে গোলাগুলির এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পিছু হটলে সেখান থেকে রফিকুলকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত রফিকুলের বিরুদ্ধে ১২টি ডাকাতি মামলা রয়েছে বলেও জানান ওসি।

এদিকে নিহত রফিকুলের স্ত্রী জানান, তার স্বামীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা ছিল তা ভিত্তিহীন।

অপরদিকে মঙ্গলবার ভোররাতে রাজশাহীতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা অধ্যাপক নূরুল ইসলাম শাহীন। তবে পরিবারের দাবি ইসলামীয়া কলেজের ওই অধ্যাপককে ধরে নেওয়ার পর নিজেদের হেফাজতেই ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ করেছে ডিবি পুলিশ।

রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার ও নগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২ টার দিকে ওই অধ্যাপককে নিয়ে নগরীর নলখোলা আশরাফের মোড় এলাকায় অভিযানে গেলে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে ডিবি পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। এসময় পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন নূরুল ইসলাম। পরে ওই এলাকা থেকে কয়েকটি ককটেল, গুলি ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, মঙ্গলবার বিকেলে পদ্মা অফসেট থেকে জামায়াত নেতা নূরুল ইসলাম শাহীনকে ধরে নিয়ে যায় ডিবি। মধ্যরাত পর্যন্ত ডিবি তাদের হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতও করেছেন। পরে সকালে হাসপাতালে তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। ডিবি পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের।

নিহত নূরুল ইসলাম শাহীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকার ইসলামীয়া কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন। তার বাড়িও ওই এলাকায়।

২৫ জানুয়ারি রাত পৌনে ৩ টার দিকে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুইজনের মৃত্যু হয়। তারা হলেন; আবুল কালাম আজাদ (৪৫) ও সুলতান (৩৮)। এদের মধ্যে আজাদের বাড়ি ভোলা এবং সুলতানের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায়।

নিহত দু’জনের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বনশ্রী আইডিয়াল স্কুলের সামনের রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে একটি গাড়িকে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলে ভেতর থেকে কয়েকজন সন্ত্রাসী র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। র‌্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছুঁড়লে এসময় তাদের গুলিতেই দুই সন্ত্রাসী মারা যায়। তবে র‌্যাবের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিহত দুই ব্যক্তির স্বজন।

নিহত আজাদের স্ত্রী শাহিনূর শীর্ষ নিউজকে জানান, তার স্বামী পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। ২৭ জানুয়ারি একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তাকে ফোন দিয়ে জানানো হয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে লাশ রয়েছে। এরপর তিনি সেখানে লাশ শনাক্ত করেন।

এদিকে নিহত হওয়ার তিনদিন পর মঙ্গলবার সকাল ৯ টার দিকে সুলতানের স্ত্রী সাবিনা ঢামেক মর্গে এসে লাশটির পরিচয় শনাক্ত করেন।

তিনি শীর্ষ নিউজকে জানান, তার স্বামী ২০ ডিসেম্বর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এরপর লোক মারফত খবর পেয়ে ঢামেক মর্গে এসে তিনি লাশ শনাক্ত করেন।

গত ২৩ জানুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন লক্ষ্মীপুরের সাবেক ছাত্রদল নেতা সোলাইমান উদ্দিন জিসান (২৮)।

গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান ওরফে জনি (৩২)। তিনি ভাইয়ের সঙ্গে কারাগারে দেখা করে যাওয়ার সময় থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এরপর স্বজনরা ঢামেক হাসপাতালের মর্গে তার লাশ শনাক্ত করেন।

২০ জানুয়ারি গভীর রাতে রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে‘ ইমরুল কায়েস (৪৫) নিহত হন। তিনি জামায়াত নেতা ও নড়াইল পৌরসভার কাউন্সিলর।

গত ১৬ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রদল নেতা মতিউর রহমান নিহত (৩৮) হন।

এ নিয়ে বিএনপি জোটের টানা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে ৮ জনই কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেন।

মাত্র ১২ দিনে মধ্যে ৮ জন মানুষের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের ঘটনায় শঙ্কিত সাধারণ মানুষ এবং মানবাধিকার কর্মীরা। হঠাৎ করে এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অপরাধীদের চিহ্নিত করে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধানের অনুরোধ জানিয়েছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিলউল আলম মজুমদার শীর্ষ নিউজকে জানান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। যদি কেউ অপরাধ করে তাহলে তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা উচিৎ।

সুত্রঃ শীর্ষ নিউজ