‘কাশ্মীরি বিউটি বাই জিনিয়াতের’ মানহীন পণ্য বিক্রি অব্যাহত

 

chardike-ad

ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ ও অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রির মাধ্যমে প্রতারণা করে যাচ্ছেন জিনিয়াত জাহান নামের এক নারী। পবিত্র কাবা শরিফে গিয়ে সেখান থেকে ফর্সা হওয়ার সাবানের লাইভ বিজ্ঞাপন প্রচার করছেন তিনি। মসজিদে নববিতে বসে সাবান ব্যবহার করার ভিডিও দিয়ে সেই সাবানকে হালাল দাবি করছেন। তবে কোনো হালাল সনদ দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, ঘরে বসে অবৈধ প্রক্রিয়ায় নিজের হাতে সাবান তৈরি করে সেই ভিডিও প্রচার করছেন। এ ছাড়া বিদেশি দাবি করে বিভিন্ন অনুমোদনহীন রং ফর্সা করার ক্রিমও বিক্রি করছেন।

‘কাশ্মীরি বিউটি বাই জিনিয়াত’ নামে ফেসবুক খুলে জিনিয়াত জাহান দীর্ঘদিন অবৈধ ও অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রি করছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) বা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)।

জানা গেছে, ফর্সা হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ পিস সাবান বিক্রি করছেন। জিনিয়াতের সাবান ব্যবহারে মুখ ও পুরো শরীর দুধের মতো সাদা করারও গ্যারান্টিও দেওয়া হচ্ছে। ‘কাশ্মীরি বিউটি বাই জিনিয়াতের’ প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জিনিয়াত। ল্যাবের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই সাবান, লোশন ও ক্রিম তৈরি করেন তিনি। এসব পণ্যে নেই বিএসটিআইরও অনুমোদন। তাদের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে গত ৩ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে ও ডিজিটালে ‘মসজিদে নববি থেকে লাইভে বাংলাদেশে সাবান বিক্রি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়। মুহূর্তেই ভাইরাল হয় সংবাদটি।

এরপর তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজ থেকে মক্কা মদিনায় ধারণ করা সেসব ভিডিও ডিলেট করেন তারা। কিন্তু এখনো থামেনি তাদের সেসব পণ্য বিক্রি। ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে পণ্য বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফেসবুক পেজে বিভিন্ন পণ্যের ছবি দেখিয়ে বলা হয়, তাদের টিমের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সাজেশন নিয়ে পণ্য কেনা যাবে।

ঢাকার অভিজাত শপিংমলে রয়েছে জিনিয়াতের শোরুম। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পুরো শোরুম সাবান, ক্রিম, সানস্ক্রিন ক্রিম, কোকোনাট ওয়েলসহ বহু কিছু দিয়ে সাজানো। নিয়ম অনুযায়ী, এসব পণ্য তৈরি করতে বিএসটিআই বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। তাদের দোকান ঘুরে দেখার পর কালবেলার পক্ষ থেকে অনলাইনে অর্ডার করা হয় দুটি পণ্য। হাতে পাওয়া পণ্যগুলোতেও মেলেনি বিএসটিআইর কোনো সিল বা স্টিকার।

সাফরোন গট মিল্ক শোপ সাবান, নাইট ক্রিম, হোয়াইটিনিং ক্রিম, নারকেল তেলসহ নানা ধরনের প্রসাধনী তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষজ্ঞ ছাড়াই এসব পণ্য তৈরির উপাদান ও উপকারিতা প্রচার করছে তারা। দাবি করছে, কোনো পণ্যেরই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বক ফর্সা হওয়া বা ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে এসব প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হয় উচ্চ মাত্রার কেমিক্যাল। বিশ্বজুড়ে এর মাত্রা কসমেটিকসের ক্ষেত্রে ২ দশমিক শূন্য শূন্য। এর অধিক ব্যবহার করলে তাতে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

চর্ম, যৌন ও লেজার সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মীর এম সিদ্দিকি কালবেলাকে বলেন, এসব ক্রিমে হাইড্রোক্লোটিন নামের একটি কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। অনেক রোগী পেয়েছি, যারা এসব জিনিস ব্যবহার করে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলেছেন। মানহীন এসব প্রসাধনী ব্যবহারের ফলে মুখে ব্রণ, মেছতা, ঘাসহ হচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা।

একই ধরনের কথা বলেছেন ইউনাইটেড হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম খান। কালবেলাকে বলেন, প্রায় প্রতিদিনই এমন রোগী আসছেন, যারা এসব প্রসাধনী ব্যবহার করে ত্বকের ক্ষতি করে ফেলেছেন। এসব প্রসাধনী ব্যবহারে বাড়ছে ত্বকের ক্যান্সারসহ নানা ধরনের রোগের ঝুঁকি। এ জাতীয় প্রতিটি পণ্য ল্যাবে টেস্ট করলেও এতে উচ্চমাত্রার কেমিক্যালের উপস্থিতি পাওয়া যেতে পারে।

বিএসটিআই পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা-২০২১ অনুযায়ী, আমদানিকৃত প্রতিটি প্যাকেট, বোতল বা ক্যানের গায়ে আমদানিকারকের, নাম, ঠিকানা, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এবং স্ট্যান্ডার্ড মার্ক সংবলিত স্টিকার যুক্ত করে ভোক্তাপর্যায়ে বাজারজাত নিশ্চিত করতে হয়। যার কোনোটিই নেই কাশ্মীরি বিউটি বাই জিনিয়াতের পণ্যে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএসটিআইর উপপরিচালক মো. রিয়াজুল হক কালবেলাকে বলেন, সাবান, ক্রিম তৈরি করে বাজারজাত করতে অবশ্যই অনুমোদন লাগবে। কেউ অনুমোদনবিহীন পণ্য তৈরি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য সেবা বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করলে অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৩৭, ৪৩, ৫২ ও ৫৩ ধারায়ও এ ধরনের অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।

ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব পণ্য কেনার ব্যাপারে ক্রেতাদের সাবধান হতে হবে। এসব পণ্য সামগ্রী ব্যবহারে নানা রকমের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের কাছেও এ ধরনের অনেক অভিযোগ এসেছে।

এসব বিষয়ে জানতে জিনিয়াতের শোরুমে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে কথা হয় প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং অফিসার মাহাদির সঙ্গে। তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে এই প্রতিবেদকের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জিনিয়াতের স্বামী এবং প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি নানা রকমের হুমকি দেন। তখন প্রতিবেদক তাদের সাবান, ক্রিম তৈরির অনুমোদন আছে কি না, থাকলে পণ্যের গায়ে লেখা নেই কেন—জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান সেই ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমাদের অনুমোদন আছে কি নেই, সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখবে। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না।